সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ (সামেক) হাসপাতালে কোটি টাকা মূল্যের লেজার লিথোট্রিপসি মেশিনটি গত পাঁচ বছর ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। দীর্ঘ সময় ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে থাকা মেশিনটি মেরামতের কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাতক্ষীরার কিডনি রোগীরা। ফলে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে বেসরকারি হাসপাতাল থেকে মাইক্রো সার্জারির মাধ্যমে বা পেট কেটে কিডনির পাথর অপসারণে মোটা অঙ্কের টাকা গুনতে হচ্ছে রোগীদের।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীদের কিডনি থেকে পাথর অপসারণের জন্য কোটি টাকা দিয়ে ক্রয় করা হয়েছিল একটি লেজার লিথোট্রিপসি মেশিন। যার মাধ্যমে কোনো প্রকার অপারেশন বা পেট কাটা ছেড়া ছাড়াই কিডনি থেকে পাথর অপসারণ করা যাবে। এতে উপকৃত হবে দূর-দূরান্ত থেকে আসা দরিদ্র কিডনি রোগীরা। কিন্তু খাতা কলমে ঠিক থাকলেও ক্রয় করার প্রায় দুই বছর পরে কয়েকদিন ব্যবহারের পর থেকেই বিকল হয়ে পড়ে আছে অত্যাধুনিক এই লেজার লিথোট্রিপসি মেশিনটি। এতে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন জেলার কিডনি রোগীরা। সামেক হাসপাতালে কাক্সিক্ষত সেবা না পেয়ে বেসরকারি হাসপাতাল থেকে মাইক্রো সার্জারির মাধ্যমে কিডনির পাথর অপসারণে মোটা অঙ্কের টাকা গুনতে হচ্ছে রোগীদের।
সামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালে আনা মেশিনটির নাম লেজার লিথোট্রিপসি মেশিনটি। এর সাথে ছিল ভিডিও ইরেটারো রেনসকোপ। এই মেশিনের সাহায্যে মানবদেহের বাইরে থেকে কিডনির পাথর ভেঙে ফেলা সম্ভব। এর ফলে অপারেশনের ধকল সইতে হয় না রোগীদের। সেই সঙ্গে রোগীদের বাঁচে অর্থ ও মূল্যবান সময়। ২০১৭ সালের দিকে টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষে ২০১৯ সালে মেশিনটি সামেক হাসপাতালে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ানের অভাবে মেশিনটি পড়ে থাকার পর ২০২১ সালে এটি প্রথমে চালু করা হয়। এসময় মেডিকেল কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ ডাঃ রুহুল কুদ্দুস মেশিনটি ব্যবহার করে পর্যায়ক্রমে সাত জন রোগীর কিডনির পাথর ক্রাশ করেন। পরে হাসপাতালের সাবেক ওয়ার্ড মাস্টার মুরাদ-এর স্ত্রীর কিডনির পাথর ভাঙার সময় মেশিনের ভিডিও ইরেটারো রেনসকোপটি নষ্ট হয়ে যায়। পরে লেজার লিথোট্রিপসি মেশিনটিও কাজ করেনি। সেই থেকে মেশিনটি আর ঠিক করা হয়নি। অদ্যাবধি সেটি বিকল অবস্থায় পড়ে হাসপাতালে পড়ে আছে।
আশাশুনি উপজেলার বিছট গ্রামের আব্দুল হাকিম মোড়ল জানান, “তার একটি কিডনিতে পাথর ছিল। সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কিডনির পাথর ভাঙা মেশিন আছে শুনে ২০২০ সালের শেষের দিকে তিনি সেখানে যোগাযোগ করেন। এসময় তাকে জানানো হয় মেশিন চালু হলে তিনি এখান থেকে চিকিৎসা নিতে পারবেন। ২০২১ সালের শেষের দিকে তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন যে, চালু করার কিছুদিনের মধ্যেই মেশিনটি নষ্ট হয়ে গেছে। পরে বাধ্য হয়ে শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে মোট অঙ্কের টাকা খরচ করে মাইক্রো সার্জারির মাধ্যমে তিনি কিডনির পাথর অপসারণ করেন।
কিডনির পাথর নিয়ে ভর্তি হওয়া আরেক রোগী জানান, ডাক্তার পরীক্ষা করে বলল পাথর হয়েছে অপারেশন করতে হবে। পেট কেটেই অপারেশন করতে হবে। মেশিন নাকি নষ্ট। এই অপারেশন বাইরের হাসপাতালে করতে অনেক টাকা লাগবে। আমরা গরিব মানুষ এত টাকা কোথায় পাবো। তাই বাধ্য হয়ে পেট কেটেই অপারেশন করতে হবে। মেশিনটি চালু হলে গরিব মানুষ উপকার পাবে।
এ ব্যাপারে হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের ডা. শরিফুল ইসলাম জানান, “এই মেশিনটি চালু থাকলে হতদরিদ্র মানুষদের কাঁটা ছেড়া ছাড়াই সফলভাবে কিডনি থেকে পাথর অপারেশন করা সম্ভব হতো। রোগীদের আর বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করা লাগত না। কিন্তু কয়েক বছর ধরে মেশিনটি নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে। তাই রোগীদের ভোগান্তি দূরীকরণে এটি চালু করা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে।
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ডাঃ রুহুল কুদ্দুস জানান, ২০২১ সালে লেজার লিথোট্রিপসি মেশিনটি চালু করার পর মাত্র সাতজন রোগীর কিডনির পাথর ক্রাশ করা হয়েছিল। আট নম্বর রোগীর কিডনির পাথর ক্রাশ করার সময় প্রথমে মেশিনের ভিডিও ইরেটারো রেনসকোপে ত্রুটি দেখা দেয়। সেই থেকে মেশিনে আর কাজ করা হয়নি। পরে মেশিনটি মেরামত করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
সাতক্ষীরার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডাক্তার মোঃ কুদরত-ই খোদা জানান, ২০২৪ সালের ২৩ জুলাই আমি যোগদান করার পর জানতে পারি যে, কিডনি থেকে পাথর অপসারণের জন্য ব্যবহৃত লেজার লিথোট্রিপসি মেশিনটি চালু করার কয়েকদিন পর থেকেই নষ্ট। বিষয়টি আমি কয়েকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। কিন্তু অদ্য বাদি কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। লেজার লিথোট্রিপসি মেশিন, কিডনি ডায়ালাইসিস মেশিনসহ হাসপাতালে নষ্ট হয়ে পড়ে থাকা অন্যান্য মেশিনগুলোর ব্যাপারে আমি স্থানীয় সংসদ সদস্যকে অবহিত করেছি। তিনি এগুলোর ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
খুলনা গেজেট/এনএম

